শীতের রাজবাড়ী ভ্রমন – প্রথম পর্ব।।

শান্তনু সাহাঃ সাউথ বেঙ্গল ডেস্কঃ- শীত পরতে না পরতেই ভ্রমনপিপাসু বাঙালি খুঁজে বেড়ান নতুন নতুন বেড়ানোর ঠিকানা। কিন্তু বহু পর্যটকই জানেন না রাজবাড়ীর ঠিকানা। আমরা তাদের জন্য নিয়ে এসেছি পাঁচটি রাজবাড়ীর ঠিকানা। পর পর পাঁচটি রাজবাড়ী নিয়ে আমরা শুরু করছি আমাদের রাজবাড়ীর বিলাসবহুল ভ্রমণ কাহিনী।

বাংলার জমিদারি ঐতিহ্যকে উপলব্ধি করতে এখন সিনেমা ও কল্পনাকে ভরসা না করলেও চলবে। কলকাতার কাছেই কয়েকটি পুরনো বনেদি প্রাসাদের অন্দরে জমিদারি মেজাজে রাত কাটানোর সুযোগ নিন। দিন দুয়েক কাটিয়ে আসুন বাংলার বাবুবিলাসের যুগে। সেই জমিদারি যুগ নেই, নেই সেই জৌলুশ, নেই জমিদারবাবুর গড়গড়ার আওয়াজ, অন্দরমহলে গৃহিনীদের পায়েলর রুনুঝুনু শোনা যাবে না, থাকবে না ঠাকুর-চাকরের আনাগোনা, দেখা যাবে না বিচারের আশায় সদরে আসা প্রজার ভীতু চাউনি, নাচমহলে তবলার বোলও শোনা যাবে না এখন, তবু সেই পুরনো ইতিহাসের আবহে কেটে যাবে চমৎকার সময়। প্রাণ পেয়ে ওঠা বিশাল কক্ষের ইট-কাঠ-পাথরের খাঁচায় খুঁজে পাবেন থমকে থাকা অমূল্য সময়কে। স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের এই সব বাড়িতে বহিরঙ্গের স্থাপত্যের পাশে পাবেন ভেতরের ইতিহাস, জীবনচর্চা ও সংস্কৃতির আঁচ। বলাখানা রাজবাড়ী।।

সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে নীলকুঠি হিসেবে গড়ে ওঠা আজকের বলাখানার আদি মালিক ছিলেন এক ফরাসী নীলকর সাহেব। পরে তা কিনে নেন জনৈক ইংরেজ। ১৮৭০ সাল নাগাদ তৎকালীন মালিক হেনরি নেসবিট স্যাভি, ১৮৩২ সালে বলাখানাতেই যাঁর জন্ম, বাড়িটি বিক্রি করতে চেয়ে বিজ্ঞাপন দেন। বাংলার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও জমিদার, পালচৌধুরি পরিবারের বিপ্রদাস তখন বিলেতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন। বাড়ি বিক্রি সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনটি ইংল্যান্ডে তাঁর চোখে পড়ে। দাদা নফরচন্দ্র সেই খবর জানতে পেরে ১৮৭৫ সালে ভাই বিপ্রদাসের জন্য বাড়িটি কেনেন। আজও পালচৌধুরি পরিবার এই বাড়ির মালিক। বিদেশ থেকে ফিরে এসে বিপ্রদাস পারিবারিক ব্যবসাকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দেন। উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং ও আসামে চা শিল্প প্রসারে তাঁর অবদান অসীম। বিপ্রদাসের মৃত্যুর পরে বাড়ির মালিক হল পুত্র রণজিৎ। তিনি একজন দক্ষ পাইলট ছিলেন এবং এখানে একটি ছোট এয়ার স্ট্রিপ বানান। এইসময় কলকাতা থেকে বহু বিশিষ্ট মানুষ তাঁর অতিথি হয়ে এখানে আসতেন। শোনা যায়, সুভাষচন্দ্র বোসও নাকি তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন। এখানে কিভাবে কাটাবেন।

চারিদিকে পুরনো গন্ধ, দামি কাঠের আসবাব, প্রায় চার ফুট উঁচু জমিদারি পালঙ্ক, ড্রেসিং টেবিল, দামি আয়না, বিশাল ড্রইং ও ডাইনিং রুম, ভিক্টোরিয়ান যুগের আরামদায়ক সোফা সেট ও কেদারা, চক মেলানো মার্বেলের মেঝে, পুরনো দিনের পাখা, ভারী ভারী আলমারি, দেওয়ালে বাঁধানো ফোটোগ্রাফ, পেন্টিং, পুরনো দেওয়াল ঘড়ি- কী নেই! প্রায় তিন শতকের পুরনো এই বাড়িটির ২ হাজার বর্গফুট জুড়ে আছে এক বিশাল বারান্দা। শুধু বারান্দায় আরাম কেদারায় বসেই চা বা কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে উপভোগ করতে পারেন রাজকীয় উষ্ণতা। সামনে প্রশস্ত লন। নিচে গাছের সবুজে ডেক চেয়ারে গা এলিয়েও সময় কাটিয়ে দেওয়া যায়। কত নাম না জানা পাখি সেখানে। চাইলে হেঁটেও আসতে পারেন এদিক-সেদিক। বাড়ির ভেতরে আছে ভিনটেজ বিলিয়ার্ড কিংবা স্নুকার খেলার ব্যবস্থা। আছে ক্যারম, টেবিল টেনিস বা তাসের বন্দোবস্তও। শীতের রাতে ঘরের ভেতরে ফায়ারপ্লেস জ্বালিয়ে বসতে পারেন। ছাদে গিয়ে দেখতে পারেন পরিষ্কার আকাশে তারার মেলা। জলঙ্গী নদী কাছেই। সেখানে গিয়ে বোটিংও করা যায়।

কিভাবে যাবেন।

সড়কপথ: ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে (এয়ারপোর্ট-যশোর রোড-বারাসত-কল্যাণী মোড়-রানাঘাট রেল ক্রসিং-ফুলিয়া-শান্তিপুর বাইপাস-কৃষ্ণনগরের আগে বাঁদিক ধরুন-নবদ্বীপ ঘাট রোডের কাছে লেভেল ক্রসিং-এর পরে বাঁদিক ধরে ৮ কিমি এগিয়ে মহেশগঞ্জ-পুরনো লাল থামের প্রবেশপথ দিয়ে ভেতরে ঢুকুন)।

ট্রেন: শিয়ালদহ থেকে কৃষ্ণনগর যাওয়ার প্রচুর ই এম ইউ ট্রেন। আরামে যেতে চাইলে কলকাতা স্টেশন থেকে ১৩১১৩ হাজারদুয়ারী এক্সপ্রেস (সকাল ৬.৫০) ও ১৩১১৭ ধনধান্য এক্সপ্রেস (বিকেল ৪.১০) এবং শিয়ালদহ থেকে ১৩১০৩ ভাগীরথী এক্সপ্রেস (সন্ধে ৬.২০) ধরতে পারেন। কৃষ্ণনগর স্টেশন থেকে বলাগর (১২ কিমি) যাওয়ার ভাড়ার গাড়ি মিলবে।

থাকা ও খরচ: ব্রেকফাস্ট-সহ ৩,৫০০ টাকা (সোম-বৃহ) ও ৪,৫০০ টাকা (শুক্র-রবি, সপ্তমী থেকে লক্ষ্মীপুজো ও ২৫ ডিসেম্বর থেকে ২ জানুয়ারি)। এসির জন্য বাড়তি ১,০০০ টাকা লাগবে। ১০ বছরের বেশি শিশুর জন্য ১,০০০ টাকা ও প্রাপ্তবয়স্কের জন্য ১,৫০০ টাকা বাড়তি লাগবে। ড্রাইভার ও আয়ার থাকার জন্য অন্য ব্যবস্থা আছে। তার জন্য লাগবে ৫০০ টাকা (খাওয়া-সহ)।

খাওয়া: মিল পিছু ৪০০ টাকা (নিরামিষ) ও ৫০০ টাকা (আমিষ)।

যোগাযোগ

বলাখানা, পোস্ট মহেশগঞ্জ, নবদ্বীপ ঘাট রোড, নদীয়া- ৭৪১৩১৫
ফোন: ৯৮৩১৩-২৮৪৮৬, ৯৮৩১২-৭০৮০৭, ০৩৩-২৩৯৯-৪৯৯৪