শীতের ছুটি কাটানোর নতুন ঠিকানা বাঁকুড়া – পুরুলিয়া সীমান্তে দোলাডাঙ্গা।।

শান্তনু সাহাঃ সাউথ বেঙ্গল ডেস্কঃ- ঠিক এই মুহূর্তে আরো একটা বাসন্তীকা বিকেল সন্ধ্যের কোলে ঢলে পড়ছে। ঠিক এই মুহূর্তে দূর কোনো গাঁয়ে, আকাশ, সূর্য, নদী, পাহাড়, সবুজ বন মেখে নিচ্ছে দিনান্তের অপূর্ব এক আলো।হাজার তারার ওড়না গায়ে সেজে উঠছে আকাশ, অথচ ঠিক এই মুহূর্তেই আমার শহরে নীড়ে ফেরা ক্লান্ত মানুষের স্রোত, সারিসারি যানবাহনের শব্দমুখরতা আর চোখ ধাঁধানো নিয়ন আলোয় আষ্টেপৃষ্টে বন্দি। ভাগ্যিস মন টাকে বন্দী করা যায়না!                                ভীষণ জ্যামে আটকে থাকা আমি মুঠোফোনে ছুঁয়ে দেখছি সদ্য উপভোগ করা দিন কয়েকের অবসর। রঙিন প্রজাপতির মত চোখের সামনে ভেসে উঠছে পুরুলিয়ার এক অখ্যাত গ্রাম দোলাডাঙ্গা। তাই মনের জানালা দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আবার দোলাডাঙ্গার চরে, কুমারীর তীরে, পলাশের জঙ্গলে, গেয়ে উঠলো মন সারি কি ভাটিয়ালি, লিখে ফেলতে চাইলো এক আকাশ দোলাডাঙ্গার জন্য !!

একটা শাল পিয়াল সোনাঝুড়ি, ইউক্যালিপ্টাস এর জঙ্গল, রাশি রাশি আগুন ঝরানো পলাশ, টলটলে জল ভরা এক শান্ত স্নিগ্ধ হ্রদ, একফালি সবুজ চর, গোটা কয়েক মাটির কুঁড়েঘর, দূরে দিগন্ত রেখায় পাহাড়ি টিলার, নীল জলের মাঝে মাঝে ছোট্ট ছোট্ট সবুজ দ্বীপ, এক দল বন্ধু, প্রাণখোলা হাসি আড্ডা গান। নাগরিক ক্লান্তি ভুলতে এর থেকে বেশি আর কিসেরই বা প্রয়োজন?
উথালপাথাল মাতাল হাওয়া সারাদিন নেচে নেচে ঝরে যায় শুকনো পাতার ঘুঙুর, সেই হাওয়ার ছোঁয়ায় ফুলে ওঠে , দুলে ওঠে কুমারী বাঁধের বুক, ইচ্ছে হলে ঝাঁপিয়ে পড়ো ওই রোদ্দুর লুটোপুটি জলে, নয়তো ভাসিয়ে দাও ডিঙি নৌকা কোনো এক সবুজ দ্বীপের উদ্দেশ্যে। সেই সবুজ দ্বীপ থেকে দেখা যায় কীভাবে রাঙা সূর্য মামা টুপ করে ডুব দেয় টিলার পিছনে, বুনো শুয়োর কোথায় ডেরা বেঁধে থাকে, ছোট ছোট চিংড়ি কোথায় ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে পাথরের নিচে, (ধরতে পারলে নিয়ে আসাও যায় সাথে, রাতে ক্যাম্প ফায়ার আর বাউল গানের আসরে মশলা দিয়ে ভেজে দেয় চিকেন তন্দুরী। কাবাব বানানোরও সব ব্যবস্থা করে দেয়, তার সঙ্গে যদি একটু মহুয়া জোগাড় করা যায়!) রাত বাড়লে আছে গা ছমছমে jungle walk আর star gazing! দেখি কুমারী বাঁধের স্থির জলে তারাদের প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে(কত টা পরিস্কার আকাশ আর দূষণমুক্ত পরিবেশ হলে এটা সম্ভব হয়!!), তিরতির করে কাঁপতে থাকে জলে স্থির নক্ষত্র, জঙ্গলে ডানা ঝাপটায় কোনো নিশাচর পাখি।

ঠিক এই মুহূর্তে শরীর রইলো পড়ে লোকাল ট্রেনের কামরায়, অটোর লাইনে, শহরের ব্যস্ততম রাস্তার বিষম যানজটে। কিন্তু মন?
“হয়তো দেখিবে চেয়ে সুদর্শন উড়িতেছে সন্ধ্যার বাতাসে।
হয়তো শুনিবে এক লক্ষ্মীপেঁচা ডাকিতেছে শিমূলের ডালে।
হয়তো খইয়ের ধান ছড়াইতেছে শিশু এক উঠানের ঘাসে।
রূপসার ঘোলা জলে হয়তো কিশোর এক সাদা ছেঁড়া পালে ডিঙ্গা বায়। রাঙ্গা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে
দেখিবে ধবল বক; আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভীড়ে।”

কোথায় থাকবেন:-

দোলাডাঙ্গা ব্যাকপ্যাকার্স ক্যাম্প।সরকারি কিছু কটেজ আছে দেখলাম, তবে তাতে থাকার ব্যবস্থা নেই বলেই মনে হল। সাকুল্যে দশ বারোটা পরিবারের বাস, তাদের পরিশ্রমেই ক্যাম্প টি চলে (অবশ্য ক্যাম্পের আইডিয়াটা ও বিনিয়োগ এক সিটি ডুয়েলার এর)। প্রত্যেকেই ভীষণ আন্তরিক ও অতিথি বৎসল। নামেই মালুম হয়েছে-‘ ব্যাকপ্যাকার্স ক্যাম্প’ তাই হোটেলে সুলভ সুযোগ সুবিধা। বিলাসিতা আশা না করাই ভালো। মাটির ঘর,খড়ের ছাউনি। রানিং ওয়াটার নেই বাথরুমে, বাঁধের জল তুলে ওরা সাপ্লাই করে। খাওয়া দাওয়া পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, গ্রামেই উৎপাদিত টাটকা সবজি , মাছ ,দেশি মুরগি সব পাবেন।প্রদীপ ,সুব্রত যথাসাধ্য চেষ্টা করে অতিথি দের দেখাশোনায়।

কিভাবে যাবেন:-

পুরুলিয়া বা বাঁকুড়া থেকে মানবাজার হয়ে দোলাডাঙ্গা। বাঁকুড়া বা পুরুলিয়া থেকে দূরত্ব 70 কিমি মত, বাঁকুড়া বা পুরুলিয়া থেকে মানবাজার অব্দি বাস পেয়ে যাবেন, সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে যাওয়াই শ্রেয়।
Nearest railway station : বাঁকুড়া।

Best time:-

প্রচন্ড গ্রীষ্মের মাস কটা বাদে যে কোনো সময়। মার্চে পলাশ দেখতে পাবেন, আর বর্ষায় কুমারী বাঁধের বুকে মেঘের লুকোচুরি, আর ঘন সবুজ বন।।