সাড়ে পাঁচশো বছরের সুপুরের কালাচাঁদজিউর মন্দির অবহেলায় ধ্বংস স্তূপে।।

ছাদের খিলানে চিড় ধরেছে। ঝোপ-ঝাড় আর আগাছায় ছেয়ে গিয়েছে মন্দিরের সর্বত্র। বছরের পর বছর অযন্ত আর অবহেলায় ধ্বংসের মুখে সুপুরের কালাচাঁদজিউর মন্দির৷

গগণচুম্বী এই মন্দিরের বয়স এখন আনুমানিক সাড়ে পাঁচশো বছর৷ লাল ইঁটের তৈরি অপরুপ কারুকার্য মণ্ডিত এই মন্দিরটি দেখতে বাঁকুড়ার হিড়বাঁধ ব্লকের সুপুর গ্রামে এখনও ছুটে আসেন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের অসংখ্য গবেষক-পর্যটক থেকে সাধারণ মানুষ। কিন্তু প্রাচীন এই মন্দির এখন পরিত্যক্ত, অবহেলিত৷

স্থানীয় ইতিহাস বলছে, কয়েকশো বছর আগে রাজস্থানের ঢোলপুর থেকে আসা রাজপুত যুবক জগন্নাথ দেব খাতড়ার সুপুর পরগনার রাজা চিন্তামনি ধোপাকে পরাস্ত করে জগন্নাথ শাহাজাদা ধবলদেব নাম গ্রহণ করে ধবলভূমের রাজা হন। এবং সেই ধবলভূমের রাজধানী হিসেবে ‘সুপুর’কেই নির্বাচিত করেন। যদিও এর আগে জগন্নাথ দেবের হাতে পরাজিত রাজা চিন্তামনি ধোপার রাজধানী ছিল ভোজদায়। জগন্নাথ শাহাজাদা ধবলদেব ‘সুপুরে’র নাম পরিবর্তণ করে রাখেন সুরপুর। এবং সেখানেই রাজমহল প্রতিষ্ঠা করে কূলদেবতা কালাচাঁদ জীউর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে বেশ কয়েকবার মন্দিরটির পুননির্মাণ হয়েছে।

সুপুরে রাজধানী প্রতিষ্ঠার প্রায় বত্রিশ পুরুষ পর রাজ পরিবারের ছোট-বড় দুই পক্ষের মধ্যে বিবাদ বাধে। তৎকালীন রাজা টেঁকচন্দ্র খাতড়া চলে যান৷রাজপ্রাসাদ কূলদেবতা কালাচাঁদ জিউকে সেখানে নিয়ে গিয়ে নতুন মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। অন্যদিকে খড়্গেশ্বর ধবলদেব অম্বিকানগরে গিয়ে নিজের রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে সুপুরের সঙ্গে রাজ পরিবারের সম্পর্ক একপ্রকার ছিন্ন হয়ে যায়। বিগ্রহ শূন্য হয়ে পড়ে মন্দিরটিও।

গ্রামবাসীরা আজও মনে করেন রাজপরিবারের তৈরি ‘কালাচাঁদ জিউ’র মন্দিরটি তাদের গ্রামের গর্ব৷ স্থানীয় বাসিন্দা প্রবীণ শিক্ষক কালীনাথ চট্টোপাধ্যায় বলেন, গ্রামবাসীদের পক্ষ থেকে দু’বার মন্দিরটি সংস্কার করা হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ছাড়া গ্রামবাসীদের সীমিত সাধ্যে এই প্রাচীণ ঐতিহ্যশালী মন্দির রক্ষা করা সম্ভব নয়। বিশিষ্ট গবেষক সৌমেন রক্ষিতও প্রাচীন এই মন্দিরটি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন৷

সংস্কারের বালাই নেই৷ নেই সংরক্ষণের ব্যবস্থা৷ গ্রামবাসীরা মনে করছেন প্রাচীন মন্দিরটি সংস্কারে উদ্যোগ না নিলে চোখের সামনে হারিয়ে যাবে জীবন্ত এক ইতিহাস। সুপুর হারাবে তার গর্ব, অহঙ্কার৷

এই কালাচাঁদজিউ মন্দির প্রতিষ্ঠার এক করুণ ইতিহাস আছে। এটি আদপে ছিল বরাভূম(বড়বাজার) রাজ‍্যের হতেরখানি তরফের সর্দারদের কুলদেবতা। এদের রাজধানী ছিল খাঁড়িপাহাড়, কিতাডুংড়ি আর কাঁটারঞ্জা শৈলমালার মাঝে বাটালুকা গ্রাম। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এদের সর্দার ত্রিভন সিংহ প্রায়ই বর্তমান বাঁকুড়ার অম্বিকা নগর, সুপুর, শ‍্যামসুন্দরপুর রাজ‍্য আক্রমণ ও লুটপাট করত। এই উপদ্রবে বিরক্ত বরাভূমরাজ বিবেকনারায়ণের নেতৃত্বে অষ্টাদশ শতকের মধ‍্যভাগে ধলভূম(ঘাটশিলা) ও বাঁকুড়ার তিন রাজার মিত্রজোট দীর্ঘদিনের যুদ্ধের পর কাটারঞ্জা পাহাড়ের সন্নিকটে পরাজিত ও নিহত করে। প্রজাগণ অশেষ নির্যাতনের শিকার হয়। হখল গবাদি পশুকে বল্লমের(বচ্ছি) খোঁচায় হত‍্যা করা হয়। অদ‍্যপি গ্রামের সেই উচ্চ বধ‍্যভূমি “বচ্ছিগাদা” বলে অভিহিত। লুন্ঠিত সামগ্রী জয়ী রাজন‍্যবর্গ নিজেদের মধ‍্যে ভাগ করে নেন। সুপুররাজ নিয়ে আসেন কুলদেবতা কালাচাঁদকে। সুপুরের মন্দির প্রতিষ্ঠার এই হল ইতিহাস।
উল্লেখ্য গঙ্গানারায়ণের সমকালীন পরাক্রমশালী চোয়ার অধিপতি লাল সিংহের পিতা ছিলেন এই ত্রিভন সিংহ।।
রিপোর্ট শান্তনু সাহা ও ছবি :- সুদীপ্ত পোড়েল